অভিশপ্ত পুতুলের আত্নকাহিনী

691

পুতুল সবারই কম বেশী প্রিয়। বড় বোনদের পুতুল নিয়ে খেলতে দেখে ছোট্ট ভাইদেরও ইচ্ছে করে পুতুল নিয়ে খেলতে। বাসায় যখন মেয়েরা পুতুলের বিয়ে দিতে ব্যাস্ত, তখন ছোট ছেলেটিও বায়না ধরে পুতুল নিয়ে খেলার। বাসার মেয়েরা পুতুলকে মেয়ে হিসেবে কল্পনা করে আর নিজেকে পুতুলের মা ভেবে আপন মনে পুতুলের সাথে কথা বলতে থাকে। কখনো কখনো মেয়েরা বিধাতার কাছে প্রার্থনাও করে যেন তাদের পুতুলের মধ্যে প্রাণের সঞ্চার হয়। একবার ভাবুন তো দেখি আপনার মেয়ে হঠাৎ করে আপনাকে বলছে যে পুতুলটি তার কথায় সাড়া দিচ্ছে। একবারও কি ভেবেছেন যে এরকম হলে কি করনীয় হতো আপনার?

আপাতত আপনি নিশ্চিত হতে পারেন যে বিধাতা এতোটা নিষ্ঠুর নন যে আপনার মেয়ের এই উদ্ভট আবদার পূরণ করে আপনাকে বিপাকে ফেলবে। তবে একান্তই আপনাকে যদি কেউ বিপদে ফেলতে চায়, তাহলে সে অভিশাপ দিবে। আপনাকে নয়, পুতুলকে। খটকা লাগলো? আচ্ছা, খুলেই বলি

পুতুল নিয়ে হলিউডে অসংখ্য হরর মুভি আছে। আসলে বলতে গেলে হলিউডের হরর মুভিগুলোর মূলমন্ত্রই হল অভিশপ্ত পুতুল। পুতুলেরা হঠাৎ করে কথা বলতে শুরু করে বা মানুষের ক্ষতি করার চেষ্টা করে। সম্প্রতি মুক্তি পেল এনাবেল। আদতে এইগুলোকে অনেকে মনে করেন মনগড়া কাহিনী। তাদের জ্ঞাতার্থে জানিয়ে রাখি, পৃথিবীতে এরকম পুতুল আছে, তাদের প্রেক্ষাপটেই কাহিনীগুলো তৈরী করা।

‘ভুতুড়ে পুতুল’ এর আরেক নাম অভিশপ্ত পুতুল। এটি হলো মূলত “ব্ল্যাক ম্যাজিক” এর একটি ফলাফল বিশেষ। এর সম্পর্কে সর্বশেষ প্রাচীন যে তথ্যটি সেটি হলো একসময় প্রাচীন মিসরে রাজা রামসিস ৩ এর শত্রুরা তাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে একটা ভিন্ন ধরনের উপায় বেছে নেয়। সেটা হলো, রামসিসের অনুকরণে একটি মোমের পুতুল বানিয়ে রহস্যময় এক উপায়ে পুতুলটিকে একটি ক্ষমতা দেয়া যে সে তাদের গোত্রভুক্ত যাকে অভিশাপ দিবে তার জীবনেই নেমে আসবে গভীর দুঃখ। এটি আসলে প্রাচীন মিসরের এক প্রকার ধর্মীয় রীতি ছিলো। অভিশপ্ত পুতুলের জন্য পাপেট, পুত্তলিকা বা ভুডো টাইপের প্রতিকৃতি ব্যবহার করা হতো।

বর্তমানে রোমে বহুল চর্চাকৃত ব্ল্যাক ম্যাজিক বা ডার্ক ম্যাজিকে এরূপ অভিশপ্ত পাপেট, পুত্তলিকা বা ভুডো প্রচুর ব্যবহৃত হয়। একটি পুতুল বা তদ্রুপ কোনো প্রতিকৃতিতে প্রাণের সঞ্চার হয় তখনই যখন তার ভিতরে কোনো অশুভ আত্মা প্রকাশ করে এবং এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় ব্ল্যাক ম্যাজিকের মাধ্যমে। কখনো কখনো কোনো অভিশপ্ত বা ভৌতিক জায়গাকে নিরাপদ করার জন্য ব্ল্যাক ম্যাজিশিয়ানরা একটি পুতুলের ভিতরে অশুভ আত্মাটিকে পুরে রাখে। অবশ্য ভুতুড়ে পুতুলের এসব ব্যাখ্যায় বৈজ্ঞানিক অনেক যুক্তিই আসতে পারে। তবে, ব্ল্যাক ম্যাজিকের বৈধতাকে বিতর্কিত করার জন্য বিজ্ঞানে খুব বেশি যুক্তি নেই। এবার আসুন, এরকম কয়েকটি অভিশপ্ত পুতুলের ব্যাপারে জেনে নেওয়া যাক।

১. রবার্টঃ  পুতুলটির নাম রবার্ট। এর মালিক ওয়েস্ট দ্বীপের বিখ্যাত চিত্রকার এবং লেখক ইউগিন অটো। রবার্ট সাহেবের চেহারার সাথে বিশ শতকের এক নাভাল অফিসারের চেহারার মিল খুজে পাওয়া যায়। ১৯০৬ সালে বাহামার একজন চাকর ইউজিনকে পুতুলটি উপহার হিসেবে দিয়েছিল। কথিত রয়েছে বাহামার ঐ চাকরটি কালো জাদু ও ভুডো চর্চায় পরদর্শী ছিল এবং তার পরিবারের সাথে তার সম্পর্ক খুব ভালো ছিলো না। পরবর্তীতে ইউগিন পরিবার পুতুলটি বাড়িতে নিয়ে আসে এবং তারা অভিযোগ করেছিল পুতুলটির মাঝে ভৌতিক কোন ব্যাপার রয়েছে। ইউগিনের পিতা মাতা বলেছিলেন, তারা প্রায়ই ইউগিনকে পুতুলটির সাথে কথা বলতে শুনত এবং পুতুলটিও কথার উত্তর দিত। যদিও তারা প্রথমে মনে করত যে ইউগিন পুতুলের হয়ে কণ্ঠ পরিবর্তন করে উত্তর দিয়ে দিত কিন্তু পরবর্তীতে তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে পুতুলটিও কথা বলতে পারে।

প্রতিবেশীরা অভিযোগ করতেন ইউগিনের পরিবার যখন বাইরে থাকতো তখন তারা পুতুলটিকে ঘরের এক জানালা থেকে আরেক জানালায় স্থান পরিবর্তন করতে দেখতো। অটো পরিবার শপথ করে বলতেন তারা পুতুলটিকে মাঝে মাঝে ভৌতিক হাসি দিতে শুনত এবং এক ঘর থেকে অপর ঘরে আবছা আলো ছায়া দেখতে পেত। মাঝে মাঝে রাতে ইউগিনের ঘর থেকে চিৎকার শুনত এবং ঘরে প্রবেশ করে দেখত সকল আসবাবপত্র এলোমেলো এবং ইউগিন এক কোণায় বসে আছে এবং বলছে, “রবার্ট এমনটি করেছে”।

১৯৭৪ সালে ইউগিন মারা যাওয়ার পর বাড়িটি বিক্রি হয়ে যায় এবং পরিবার নতুন একটি বাড়িতে স্থানান্তরিত হয়। নতুন পরিবারে একটি ১০ বছরের মেয়ে ছিল। রবার্ট সাহেব বেশী অপেক্ষা করেননি। কিছু দিনের মধ্যেই মেয়েটিও চিৎকার করতে শুরু করে এবং অভিযোগ করে রবার্ট সাড়া ঘরে ঘুরে বেড়ায়। প্রায় ত্রিশ বছর পর মেয়েটি এক সাক্ষাতকারে দাবি করে পুতুলটি জীবীত এবং তাকে হত্যা করতে চেয়েছিলো কয়েকবার

এরপর কোন এক অক্টোবর মাসে রবার্টকে কি ওয়েস্ট এর জাদুঘর ওল্ড অফিস এন্ড কাস্টমস হাউস এ দিয়ে দেয়া হয় । জাদুঘরের কর্মচারীরাও অভিযোগ করতো,এই পুতুলটা আসার পর থেকে জাদুঘরে অস্বাভাবিক সব কাজকারবার বেড়ে গেছে যা আগে কখনো ঘটেনি ! ২০০৮ সালের মে মাসে ফ্লোরিডার ক্লিয়ারওয়াটার
নামক স্থানে একটি প্যারানরমাল কনভেশনের আয়োজন করা হয় রবার্ট কে নিয়ে । পুতুলটির কথা জানার ১০৪ বছর পর এই প্রথম এটিকে কি ওয়েস্ট থেকে একেবারে নিয়ে যাওয়া হয় ফ্লোরিডার ফোর্ট ইস্ট মার্ট জাদুঘরে। কি ওয়েস্ট থেকে যারা ফ্লোরিডায় আসেন , তারা তাদের আদরের রবার্ট কে একনজর দেখ যান।

প্যারানরমাল কনভেশনে কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয় রবার্টকে নিয়ে । এমন কিছু প্রমাণ মিলেছে যা রবার্টকে একটা সাধারণ পুতুল থেকে আলাদা করে দিয়েছে। রবার্ট এখনও ফ্লোরিডার ফোর্ট ইষ্ট মার্টেল জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। আপনি যদি নিজ দায়িত্বে ঐ জাদুঘরে যেতে চান এবং রবার্ট ভদ্রলোকের ছবি তুলতে চান , তবে আপনার জন্য একটা উপদেশ আছে। সতর্কতাও বলতে পারেন। রবার্টের ছবি তোলার আগে আপনাকে অবশ্যই অত্যন্ত মার্জিত ভাষায় রবার্টের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। রবার্ট কোনো দিকে ঘাড় কাত করলে বুঝবেন রবার্ট সাহেব অনুমতি দিয়েছেন। তার অনুমতি ব্যাতীত ছবি তোললে আপনার পরিবারের উপর রবার্ট সাহেব অভিসম্পাত করবেন। রবার্ট কে নিয়ে হলিউডে “the curse of Robert the doll” নামে সিনেমা নির্মিত হয়েছে। যদিও এই ছবিতে শুধুমাত্র রবার্টের নাম ব্যাবহার করা হয়েছে। কাহিনী নয়।

২. অ্যানাবেলঃ  ১৯৭০ সালের কথা। আমেরিকার কোন এক শহরে এ্যাঞ্জি এবং ডোনা নামের দুইজন নার্সিং ইন্সটিউটের ছাত্রী একসাথে একটি এ্যাপার্টমেন্টে থাকত। একদিন ডোনা তার ২৮ তম জন্মদিনে তার মার কাছ থেকে একটি পুতুল জন্মদিনের উপহার হিসেবে পায়। পুতুলটা দেখতে এত কিউট ছিল যে, ডোনা সেই পুতুলটাকে সবসময় তার বিছানার পাশে রাখত। কিন্তু সে কখনও ভাবে নাই যে তার মার দেওয়া এই পুতুল একসময় তাদের দুশ্চিন্তার কারন হয়ে দাঁড়াবে।

একদিন ডোনা আর এ্যান্জী বাসায় ফিরে এসে দেখে যে, ডোনার পুতুলটি অন্য একটি জায়গায় পরে আছে। প্রথমে সেটাকে স্বাভাবিক ভাবেই নেয় তারা। কিন্তু যত দিন যেতে থাকে, পুতুলের স্থান পরিবর্তনের ঘটনা তত ভয়াবহ হতে থাকে। এমনকি তারা একদিন এটাও দেখতে পায় যে, সেই পুতুলটি তাদের বিছানায় পরে আছে কিন্তু তাদের স্পস্ট মনে আছে যে তারা এটাকে তাদের শেলফে রেখে গিয়েছিল।

ল্যূ নামের তাদের এক ছেলে বন্ধুর কাছে সেই পুতুলটি সন্দেহজনক মনে হতে লাগল। তার ধারনা, যা ঘটছে তার পেছনে এই অশুভ পুতুলের হাত রয়েছে। সেই জন্যে সে ডোনাকে বলেছিল যে পুতুলটাকে যেন ফেলে দেয়। আধুনিক সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা ডোনার কাছে এসব অশুভ ভুত প্রেত শুধুই কুসংস্কার মনে হতে লাগল। সেই জন্যে সে ল্যু এর কথায় কোন পাত্তা দিচ্ছিল না। কিন্তু একদিন যখন ডোনা তার সেই পুতুলটাকে রক্ত মাখা অবস্থায় তার বিছানায় শোয়ে থাকতে দেখে, এরপর আর এসব সে সহ্য করতে না পেরে দ্রুত করে এক ওঝাকে ডেকে আনে।

ওঝাকে ডেকে আনার পর ওঝা তার আধ্যাত্মিক শক্তির মাধ্যমে জানতে পারল যে, ডোনা আর এ্যাঞ্জী যে বাসায় থাকে সে বাসা আগে এক বড় ময়দান ছিল আর সেই ময়দানে অ্যানাবেল হিগেন নামের এক সাত বছর বয়সী মেয়েকে হত্যা করা হয়েছিল। সেই বাচ্চা এ্যানাবেলের আত্মার নাকি ডোনাকে খুব পছন্দ হয়েছে এবং সে এই পুতুলের উপর ভর করে তাদের সাথে থাকতে চায়। সেই আত্মা তাকে এটাও জানায় যে, সে তাদের কোন ক্ষতি করবে না, শুধুমাত্র সে তাদের সাথে থাকতে চায়।
দয়ালু ও নরম মনের ডোনা এ কথা শুনার পর অ্যানাবেলের আত্মার প্রতি তার সহানুভূতি জন্মায়। সে সেই আত্মাটিকে তাদের সাথে থাকতে দেয়। কিন্তু এইটা যে তাদের সবচেয়ে বড় ভুল হয়ে দাড়াবে, তা তারা কখনও ভাবেনি।

তাদের সেই ছেলে বন্ধু ল্যু একদিন স্বপ্নে দেখতে পায় যে, সেই পুতুলটি তার পায়ের কাছে বসে আছে । সে সময় সে অনুভব করে তার পা যেন অবশ হয়ে আছে। আর সেই অবশ পা বেয়ে অভিশপ্ত পুতুলটি তার বুকের উপড় উঠে এবং তার বুকে, মুখে আর মাথায় আঁচড় দিতে থাকে। এই দুঃস্বপ্ন দেখে তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। ভাবতে থাকে, না জানি কিইবা ঘটছে সেই মেয়েদের সাথে।

ঘটনা এখানে থেমে থাকেনি। একদিন যখন ল্যু আর এ্যাঞ্জি রোড ট্রিপের জন্য বের হচ্ছিল, তখন তারা ডোনার রুম থেকে কিছু খচখচ আওয়াজ শুনতে পায়। সে শব্দ শুনে ল্যু ডোনার রুমের দরজা খুলে দেখে যে, রুমের সবকিছু ঠিক আছে, শুধুমাত্র সেই পুতুলতি ছাড়া। পুতুলটিকে সে বিছানার এক কোনায় পড়ে থাকতে দেখে। সে যখন পুতুলটির দিকে এগিয়ে যায়, তখন হঠাৎ তার নাকে কিসের যেন পোড়া গন্ধ লাগে। সে এই পুড়া গন্ধের উৎস খুজার জন্য পিছনে তাকালে কিছুই দেখতে পেল না। কিন্তু এর মধ্যে সে হঠাৎ তার বুকে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব করতে শুরু করে। তার বুকের দিকে তাকাতেই সে দেখতে পেল যে, তার বুকের মাঝে নখের আঁচড়। ঠিক যেন কেউ নখ দিয়ে আঁচড় এঁকে তার উপর আগুনের ছ্যাকা দিয়ে রেখেছে । তার বুঝতে দেরী হচ্ছিল না যে এসব কিছু এই অভিশপ্ত পুতুলেরই কারসাজি।

তার এই আঁচড় এত দ্রুততার সাথে মুছতে শুরু করল যে, ২ দিনের ভেতর তা পুরোপুরি মুছে গেল। এমন পরিস্থিতিতে তারা বুঝতে পারল যে, অনেক বিপদজনক কিছুর একটার সাথে জড়িয়ে গেছে তারা। তাদের অনেক বড় কারও সাহায্য দরকার। তারা তখন শরনাপন্ন হল তখনকার বিখ্যাত এক্সরসিজম স্পেশালিষ্টের কাছে, যাদের নাম এ্যাড এবং ল্যরেন ওয়ারেন। ল্যরেন দম্পতি পরে জানতে পারলেন যে, পুতুলটি আসলে অভিশপ্ত ছিল না। পুতুলটি শুধু আত্মার একটি মাধ্যম ছিল মাত্র। আর সেই আত্মার মূল লক্ষ্য ছিল ডোনার, যেটাকে ভর করে সে আবার আমারনত্ব লাভ করবে।
পরবর্তীতে একজন পাদ্রীকে দিয়ে তাদের এ্যাপার্টমেন্টকে এক্সরসিজমের মাধ্যমে বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর ওয়ারেন সেই পুতুলটিকে তাদের সাথে নিয়ে যান। পুতুলটিকে তাদের সাথে নিয়ে যেতে রাস্তায় ওয়ারেনদের অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। এরপর সেই পুতুলটি ওয়ারেন এর বাসায় আবার তার আগের কার্যকলাপ দেখাতে শুরু করে । এক রুম থেকে অন্য রুমে বিচরন করতে থাকে পুতুলটি। এ্যাড এই অবস্থার স্বাভবিক করার এক ক্যাথলিক বিশপ ডাকেন পুতুলটিকে এক্সোরসিজমের মাধ্যমে জন্য বন্ধ করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু সেই পাদ্রি পুতুলটির বিদ্রুপ করায় সেই পাদ্রিকে এর ফল ভোগ করতে হল। সেখান থেকে পাদ্রি বাসায় ফেরার সময় তার কারের ব্রেইক ফেইল হয় এবং এক বিরাট এক্সিডেন্টের মাধ্যমে মারা যান সেই পাদ্রি। পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ায় লরেন সেই পুতুলটিকে পবিত্র পানি দিয়ে ধোয়ে একটি সুরক্ষিত শোকেইসে তালাবদ্ধ করে রাখেন। সেই সময় থেকে এখন পর্যন্তও সেই পুতুলটি লরেনদের সংগ্রহশালায় একইরকম ভাবে আবদ্ধ আছে। সেই পুতুলটিকে দেখলে এখনও এমন মনে হয় কিছু একটা এখনও তার মাঝে জীবিত আছে। সেই জিনিসটা অপেক্ষায় আছে, কখন সে এই খাঁচা ছেড়ে বের হবে, আর কখন সে নতুন কারও শরীর খুজে বের করবে তার আমরনত্ব লাভের জন্য। এনাবেল কে নিয়ে সম্প্রতি যে ছবি বের হয় সেখানেও এনাবেলের নাম ব্যাবহার করা হয়েছে শুধুমাত্র। কাহিনী নয়।

৩.ল্যাটা দ্যা ডলঃ   কেরী ওয়ালটন নামক এক ব্যাক্তি ছোট বেলায় একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে ভৌতিক একটা কিছু দেখে প্রচুর ভয় পেয়েছিলেন। এই ভয় তাকে কয়েকবছর ধরে তাড়া করেছিল। অবশেষে ১৯৭২ সালে পুনরায় রহস্যের সমাধান করতে যান। বাড়িটির বারান্দা থেকে একটি পুতুল আবিষ্কার করেন এবং সেটিকে তিনি সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। অনেকের মতে পুতুলটি প্রায় দুশো বছর আগে একজন রুমানিয়ান নাগরিক তার পানিতে ডুবে মারা যাওয়া ছেলের জন্য তৈরি করেছিলেন। পুতুলটির ভিতরে ছেলেটির আত্মা বাস করে বলে অনেকের ধারণা। পুতুলটির চুল আসল মানুষের তৈরী। রুমানিয়ান ঐতিহ্য অনুসারে পুতুলটির নাম রাখা হয় ল্যাটা।

পুতুলটিকে অনেকেই নড়াচড়া করতে দেখেছেন। যখন পুতুলটিকে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়, হঠাৎ করেই বৃষ্টি নেমে পড়ে। পুতুলটি নিয়ে কোনো রুমে প্রবেশ করলে সেখানে ঝুলন্ত কোনো ছবি খসে যায়। কুকুর বা অন্যান্য প্রাণীরা ল্যাটাকে দেখামাত্র আক্রমণ করার চেষ্টা করে। কোনো মানুষ ল্যাটার দিকে তাকিয়ে থাকলে আকস্মিক ভাবে ভয় পেয়ে যায় বা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে বলে অনেকের কাছে শোনা গেছে।

৪.দ্যা ভুডো জম্বি ডলঃ  এই পুতুলটি প্রস্তুতকাল ২০০৪ সালে। নিউ অরলিনে পুতুলটি প্রস্তুত হয় এবং একই বছর ebay এর মাধ্যমে টেক্সাসের গ্যালভস্টোনে বসবাসরত এক মহিলা পুতুলটি কিনেন। পুতুলটি বিক্রি করার সময় এর বিক্রেতা এডভার্টাইজমেন্ট ডিটেইলস এ লিখেছিলেন ‘the doll is “very active” and “almost alive”.

পুতুলটি ডেলিভারির সাথে সাথে পুতুলটির সাথে কিছু নিয়মাবলী সম্বলিত একটি তালিকা ছিলো যার মধ্যে প্রধান শর্তটি ছিলো পুতুলটিকে রূপার কেসিং থেকে আলাদা না করতে। কিন্তু দুর্ভাগা মহিলাটি কোনো শর্ত না মেনেই পুতুলটিকে এর রূপার কেসিং থেকে আলাদা করে ফেলেন। সে মহিলা একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে পুতুলটি স্বপ্নে তাকে প্রতিনিয়ত আক্রমন করতো। তিনি পুতুলটিকে অনেকবার ধ্বংস করার চেষ্টা করেও ব্যার্থ হন। একবার মাটিচাপাও দিয়েছিলেন কিন্তু পরেরদিনই সকালে বাসার দরজার সামনে পুতুলটিকে দেখতে পান। পুতুলবটিকে একাধিকবার তিনি অন্য বিক্রেতার কাছে বিক্রি করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু, নতুন ক্রেতা ডেলিভারী হিসেবে খালি বাক্সটিই পেয়েছিল। পুতুলটিকে রহস্যজনকভাবে সেই মহিলার বাসায়ই পাওয়া যেত। এমনভাবে পাওয়া যেত যেন পুতুলটিকে সেই রূপার কেস থেকে কখনোই অপসারণ করা হয় নি। অবশেষে একজন “ভুত শিকারী” বা ব্ল্যাক ম্যাজিশিয়ানের কাছে পুতুলটি হস্তান্তর করতে সমর্থ হোন। তবে, সেই অশুভ আত্মা কখনোই মহিলার পিছু ছাড়েনি। দুঃস্বপ্নকে নিত্যসঙ্গী করে নিতে হয়েছিলো মহিলাকে।

৫.ডেভিল বেবী ডলঃ ডেভিল বেবি ডল নিয়ে কিছু বলার আগে একটা কাহিনী জেনে নেওয়া দরকার। আমেরিকার বিখ্যাত ভুডো চর্চাবিদ মেরি ল্যাভিওর নাম কম বেশি সবাই জানেন। যাই হোক, ঘটনার সময়কাল হবে ১৮০০ সাল। এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ের বিয়ে ঠিক হয় আরেক সম্ভ্রান্ত স্কটিশ ব্যাক্তির সাথে। মেয়েটির সাবেক প্রেমিক এই ঘটনায় ঈর্ষাণ্বিত হয়ে মেরি ল্যাভিওর কাছে যায় এবং তাকে অনুরোধ করেন এমন কিছু করতে যা নব্যবিবাহিত দম্পতির জন্য একটা শিক্ষা হবে। মেরি নব্যবিবাহিত দম্পতিকে একটি শক্তিশালী অভিশাপ দেন (ভুডো চর্চার কার্যকলাপ সাধারণত অভিশাপ হিসেবেই দেখা হয়)। এর ফলে দম্পত্তিটি প্রথম সন্তান জন্ম দেওয়ার পরপরই মারা যায়। শিশুটির চেহারা এবং গড়ন ছিলো বিকৃত এবং পাতালের অগ্নিদেশের দেবতা বা ডেভিলের ন্যায়।

মা বাবার মৃত্যুর পর মেরি সেই শিশুটিকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন এবং আমৃত্যু তাকে নিজ সন্তানের মতোই যত্ন করেন। কাকতালীয়ভাবে মেরি মারা যাওয়ার পরপরই সেই ডেভিল সদৃশ শিশুটিও মারা যায়। শিশুটিকে মেরির কবরের পাশেই সমাহিত করা হয়েছিল। কিন্তু, এরপরই শুরু হয় যত বিপত্তি। কথিত ছিলো, শিশুটির আত্মা শহরের এক অন্ধকার জায়গায় লুকিয়ে ছিলো এবং যখনই কোন হতভাগা ব্যাক্তি সে জায়গায় বা আত্মার সংস্পর্শে আসতো, মৃত্যুকে বরণ করে নিতে হতো। স্থানীয় লোকজন মাটি খুড়ে অনেক অপ্রয়োজনীয় জিনিস বের করে তাদের বাড়ির সামনে ঝুলিয়ে রাখতেন যাদের অধিকাংশই ছিলো পুরোনো পুতুল। তাদের বিশ্বাস ছিলো এইগুলো দেখে অশুভ আত্মারা ভয় পেয়ে যায়। এসব পুতুলগুলো বর্তমানে খুজে পাওয়া খুবই কঠিন। কারণ অধিকাংশ পুতুলগুলো প্রত্নতত্ত্ববিদদরা বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে সংগ্রহ করে নিয়ে গেছেন।

ডেভিল বেবি ডলের আধুনিক সংস্করণটি নিউ অরলিনের একটি জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। এটির প্রস্তুতকাল বিশ শতকের গোড়ার দিকে। পুতুলটি যেসব মানুষদের কাছে ছিলো, তাদের ভাষ্যমতে পুতুলটি ঘরে এর মালিকের দিকে তাকিয়ে থাকে। এর মণি আপনা আপনি মালিকের চলাফেরার দিকে নাড়াচাড়া করতে থাকে। কখনো কখনো এরা ভয়ঙ্কর আওয়াজ করতো যা ইঙ্গিত দিত পুতুলটি তাদের জন্য ভয়ঙ্কর এক বিপদ নিয়ে আসতে যাচ্ছে।

৬.পুপাঃ  পুপার প্রস্তুতকাল ১৯২০। পুপাকে যার জন্য বানানো হয়েছিল তিনি ছিলেন একজন ইটালিয়ান। পুতুলটিকে প্রায়ই তার মালিকের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ জামা পড়িয়ে দেওয়া হতো। এমনকি পুপার চুলগুলোও তার আসল মালিকের ছোটবেলার অবশিষ্ট চুল বা চুল কাটার পর মেঝেতে যেসব চুল পড়ে থাকতো সেগুলো দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। চুলের গড়ন থেকে শুরু করে জামা, পুপার সবকিছুই তার মালিকের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিলো। কখনো কখনো পুপার সাথে প্রকৃত মালিকের ছবিতে পুপা এবং মালিককে আলাদা করা দুরহ হয়ে পড়তো। পুপার মালিকের পরিবার প্রায়ই লক্ষ্য করতেন যে, বিভিন্ন ছবিতে পুপাকে একদম জীবিত দেখাতো।

পুপার মালিক প্রায়ই বলতেন ছোটবেলায় পুপা তার সাথে কথা বলতো। আমৃত্যু বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে পুপাকে তিনি একটি জীবিত সত্তা হিসেবে উল্লেখ করেন। ২০০৫ সালে মালিকের মৃত্যুর পর পুপাকে পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুসারে একটি গ্লাসের বাক্সে রেখে দেওয়া হয়। কিন্তু পুপাকে বক্সে স্থির পাওয়া যায়না কখনোই। এটিকে বিভিন্ন সময় বাক্সের ছোট পরিসরে আলাদা আলাদা জায়গায় পাওয়া যায়। পুপাকে খুব কমই বাক্স থেকে বের করা হয়। কিন্তু, বিভিন্ন সময়ে পুপার মুখের ভাব দেখেই বোঝা যায় পুপা বাক্স থেকে বের হওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। শোনা যায় একবার পুপা গ্লাসের বাক্সের গায়ে ঠক ঠক করে নক করেছিল যেমনটি কাউকে জোর করে কোনো ঘরে বন্ধ করে রাখলে হয়ে থাকে।

৭.মেন্ডিঃ  মেন্ডির প্রস্তুতকাল ১৯১০ থেকে ১৯২০ এর মাঝামাঝি সময়ে। ইংল্যান্ড মতান্তরে জার্মানিতে একে প্রস্তুত করা হয়। মেন্ডি চীনামাটির তৈরী একটি বেবি ডল। মেন্ডি ব্রিটিশ কলম্বিয়ার কোয়েসনেল জাদুঘরে ১৯৯১ সাল থেকে সংরক্ষিত আছে। মেন্ডিকে যিনি এই যাদুঘরে ডোনেট করেছিলেন তিনি বেশ কিছুদিন মেন্ডির মালিক ছিলেন।

তার ভাষ্যমতে মেন্ডিকে তিনি তার বাসার বেজমেন্ট থেকে খুজে পান। এক মধ্যরাতে তিনি তার বাসায় বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনতে পান। তারপর সারাবাড়ি খুজে শব্দের উৎস বের করতে করতে মেন্ডিকে পেয়ে যান। তবে অন্যান্য ভুতুড়ে পুতুলগুলোর তুলণায় মেন্ডি কিছুটা দুষ্ট পুতুল বটে। জাদুঘরের কর্মচারীর বলেছেন মেন্ডিকে আনার পর থেকেই যাদুঘরের বিভিন্ন জিনিস হারিয়ে যেতে থাকে। সেগুলোকে জাদুঘরের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষিপ্তভাবে পাওয়া যায়। সেই সাথে কিছু অস্বাভাবিক পায়ের ছাপও। মেন্ডির জন্য আলাদা একটি বক্সের ব্যাবস্থা করা হয়। কারণ অন্যান্য পুতুলগুলোর সাথে মেন্ডিকে রাখা যেত না। যাদুঘরের কর্মচারীরা জানিয়েছেন মেন্ডি অন্যান্য পুতুলদেরকে খোচা দেয় এবং প্রদর্শনীর জায়গাটিকে এলোমেলো করে ফেলে। মেন্ডির ক্যামেরা নিয়ে কিছুটা অস্বস্তি আছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেন্ডির ছবি তোলার সময় মেন্ডিকে ছবিতে ক্যাপচার করা যায় না। ক্যাপচার করা ছবিতে মেন্ডির জায়গাটা ফাকাঁ দেখা যায়। খুব অল্প ক্ষেত্রেই মেন্ডির ছবিতে মেন্ডিকে ক্যাপচার করা গিয়েছে।

৮.পুলাও উবিন বার্বিঃ  ঘটনা ১৯১৪ সালের। ব্রিটিশ আর্মি কতৃক সিঙ্গাপুরের পুলাও উবিন এ বসবাসরত এক জার্মান দম্পতি সন্দেহভাজন হয়েছিলেন। তাদেরকে গুপ্তচর হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছিল। ব্রিটিশ আর্মি সেই জার্মান দম্পতিকে ধরতে সক্ষম হয়। কিন্তু দম্পত্তির মেয়েটি পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। দৌড়াতে দৌড়াতে পা পিছলে পাহাড় থেকে পড়ে গিয়ে মর্মান্তিকভাবে মেয়েটির মৃত্যু হয়। স্থানীয় লোকেরা মেয়েটিকে সমাহিত করে এবং মেয়েটির ও তার পরিবারের করুণ পরিণতির জন্য মেয়েটির সমাধির কাছে চীনামাটির একটি বেদী নির্মাণ করা হয় যেখানে মেয়েটির চুল এবং ব্যাবহৃত একটি ক্রুশ লকেট ছিলো। কিছুদিন পর পুলাও উবিনের এক লোক স্বপ্নে দেখেন যে সেই মেয়েটি লোকটিকে স্থানীয় এক খেলনার দোকানে নিয়ে গিয়ে একটা পুতুলের দিকে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে। লোকটি একাধারে তিনদিন একই স্বপ্ন দেখার পর লোকটি সেই দোকানে যান এবং সেই পুতুলটিকে পেয়ে যান।

সবচেয়ে অবাক বিষয় ছিলো লোকটি স্বপ্নে পুতুলটিকে যেভাবে দেখেছিলেন, পুতুলটি বাস্তবে দেখতে অবিকল সেরকম। পুতুলটিকে ক্রয় করে সেটিকে একটি মঠে নিয়ে যান। তিনি অনুভব করেন মেয়েটির আত্মা পুতুলটিতে প্রতিস্থাপিত হচ্ছে। এরপর থেকেই পুতুলটি সেই মঠের সংরক্ষিত। দর্শনার্থী এবং স্থানীয়রা পুতুলটির উদ্দ্যেশ্যে অনেক কিছু উৎসর্গ করেন। তাদের বিশ্বাস পুতুলটি তাদেরকে বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করবে এবং জীবনে সুখ আনবে।

সুপ্রিয় পাঠকগন, উপরিউক্ত ঘটনা বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের স্বাধীণতা আপনার আছে। তবে, এসব নিয়ে এতো কিছু আপাতত আপনাকে ভাবতে হবে না। কারণ এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ভুডো চর্চায় পারদর্শী কাউকে পাওয়া যায় নি। অতএব আপনার সাথে এসব হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। তবে হ্যাঁ, যদি একান্ত আপনার সন্তানের প্রার্থনা বিধাতা কবুল করেই ফেলে, তাহলে আপনার জন্য উপদেশ পুতুলটিকে কোনো জাদুঘরে দিয়ে দিবেন। এখন পর্যন্ত অভিশপ্ত পুতুল দ্বারা কারও মারা যাওয়ার খবর পাওয়া যায় নি। হ্যা ওইটা আলাদা কথা হরর মুভিতে অন্যাটাই দেখানো হয়।

 

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
4

পাঠক মতামতঃ