খালেদ মাহমুদ সুজন: উনিই কেনো শুধু বিদ্রুপের শিকার হবেন ?

65
barta-khaled

গতিদানব কথাটা শুনলেই স্বাভাবিকভাবে আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে ব্রেট লি, শোয়েব আক্তার, শন টেইট, ডেইল স্টেইন, কোর্টনি ওয়ালস, মাইকেল হোল্ডিং এর মত খেলোয়াড়দের প্রতিচ্ছবি। আমাদের বাংলাদেশেও একজন ‘গতিদানব’ আছেন; তিনি মাশরাফি, রুবেল কিংবা তাসকিন নন, তিনি আমাদের খালেদ মাহমুদ সুজন।

খালেদ মাহমুদ সুজন ভাইকে ‘গতিদানব’ বলে আখ্যায়িত করছি আমরা জনসাধারনই, কিন্তু, পার্থক্য হচ্ছে আমরা ব্রেট লি, শোয়েব আক্তারদেরকে ‘গতিদানব’ বলছি প্রশংসা করে আর সুজন ভাইকে আমরা ‘গতিদানব’ বলছি ঠাট্টা-উপহাস করে।

অনেকেই বলবেন ‘এতে কি হয়েছে? আপনার এত জ্বলে কেন?’ না, ভাই, আমার জ্বলার কিছু নেই। তবে, এটা কি বাড়াবাড়ি নয়?

এটা ঠিক যে জাতি হিসেবে আমরা বাঙালিরা সব সময় ঠাট্টা মশকরা অনেক পছন্দ করি সেটা এখনকার প্রজন্মদের সোশ্যাল মিডিয়াতে বিভিন্ন স্ট্যাটাস এবং কমেন্ট পড়লেই সহজেই অনুমান করা যায়। সুজন ভাইকে নিয়ে অনেকের ট্রল করার কারন হিসেবে বলে থাকেন যে, তিনি একাধিক পদে কাজ করছেন, বিসিবিতে তার হাত আছে, এছাড়া, খেলোয়াড় হিসেবে তিনি ভাল ছিলেন না, আর তিনিই কিনা বাংলাদেশ টিমের টিম ডিরেক্টর হয়েও কোচের কাজ করবেন???!!!

এটা কি আর সহ্য করা যায়? ব্যস, আমরা তাকে নিয়ে এবার যত ধরণের ট্রল আছে সব ধরণের ট্রল তাকে নিয়ে করা শুরু করে দিলাম। একটি ক্রিকেটের পেজে দেখলাম কেউ কেউ তার বোলিং গতি ১২২ কি.মি./ঘণ্টা উঠেছে বলে, বলছে যে গতিদানব তো এর থেকে বেশি উঠাতে পারবে না, আবার কেউ কেউ বলেছে তার গতি ১৮০ কি.মি. এর উপরে উঠবে। এমন কিছু কথা হচ্ছিল বিভিন্ন কমেন্টে (২০০৪ সালে বাংলাদেশ ঘরের মাঠে প্রথমবার যখন ভারতকে হারিয়েছিল সেই ম্যাচে করা একটা ডেলিভারির গতির স্ক্রিনশট দেখিয়ে বলা হচ্ছিল)। যাইহোক, এ রকম আরো অনেক কথাই হচ্ছিল তাকে নিয়ে, কিছু কিছু মানুষ আছেন তার পুরো ক্যারিয়ার নিয়েও ট্রল করছেন।

sujonঅনেকের জন্ম ২০০০ সালের পর,  সেসব ছেলেরাও তাকে নিয়ে ট্রল করছে। হয়ত এরা এর খেলাও দেখে নি তারপরেও অন্যের সাথে তাল মিলিয়ে ট্রল করে যাচ্ছে, ট্রল তো করাই যায়। আমরা তো ঠাট্টা মশকরা করতেই পারি, তো এতে কি হয়েছে? কিন্তু আপনারা নিজেরাও কি জানেন যে আপনারা ট্রলের সীমা ছাড়িয়ে গেছেন? আপনারা নিজেরা নিজেদেরকেই প্রশ্ন করুন, আপনারা তাকে নিয়ে ট্রল এর মাত্রাটা বেশি করে ফেলছেন কিনা?  যে মানুষটির হাত ধরে ১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ, যিনি সেই ম্যাচে এই গতি নিয়েই ম্যান অব দ্যা ম্যাচ হয়েছিলেন তার ৩১ রানে গুরুত্বপূর্ণ ৩ উইকেট নেয়ার সৌজন্যে আজ আমরাই তাকে ট্রল করছি। সেদিনের ম্যাচের স্কোরকার্ড

sujon-pakistanসেদিন, পাকিস্তান এবং স্কটল্যান্ডকে হারানোর সৌজন্যে আমরা ICC তে জোর দাবি করতে পেরেছিলাম টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার জন্য, টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর ধীরে ধীরে বাংলাদেশ আজ এ অবস্থায় এসেছে। এ অবস্থায় একদিনে আসে নি, বছরের পর বছর টানা হার, বিভিন্ন দেশ এবং ক্রিকেটের অনেক স্বনামধন্য ব্যক্তিরা বাংলাদেশকে বিভিন্নভাবে হেয় করেছে। অনেকে জোর দাবি করেছিল বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস কেড়ে নেয়ার জন্য। কিন্তু বাংলাদেশ সব বিদ্রূপ, ঠাট্টা, মশকরা সহ্য করে আজ এ পর্যন্ত এসেছে। যে মানুষগুলো একটি ম্যাচ জেতার মধ্য দিয়ে পুরো বাংলাদেশের মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলে, আমরাই কিনা সেসব ক্রিকেট খেলোয়াড় বা মানুষগুলোকে বিভিন্নভাবে ট্রল করে আসছি। শুধু সেসব ক্রিকেট খেলোয়াড়দেরই নয়, আমরা তাদের পরিবারের সদস্যদেরকে নিয়েও অনেক ধরণের ট্রল করে আসছি। আমরা ভুলে যাই, তারাও আর ১০ জন মানুষের মত মানুষ, তাদেরও ফ্যামিলি আছে, তারাও ম্যাচ হারলে আমাদের থেকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায়।

barta-sujon২০০৩ সালে পাকিস্তানে মুলতান টেস্টে প্রায় জেতা ম্যাচটি ১ উইকেটে হারার পর ততকালিন টেস্ট অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ সুজন কেঁদেছিলেন। ২০০৩ সালে পাকিস্তানে তৃতীয় টেস্টে মুলতানে প্রায় জেতা ম্যাচটি বাংলাদেশ হেরেছিল ১ উইকেটে। সেই ম্যাচের স্কোরকার্ড

ম্যাচ শেষে ততকালিন টেস্ট অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ সুজন যখন অশ্রুশিক্ত নয়নে মাঠ ত্যাগ করেন তখন তার এই কান্নাটাই ছিল পুরো বাংলাদেশের কান্না। ভাবতে অবাক লাগে, আমরা আজ এসব মানুষকে গালাগাল করি, ট্রল করি, ‘গতিদানব’ বলে ঠাট্টা করি। কি দরকার ছিল ওনাদের খেলার? ওনারা কি শুধু পয়সা রোজগার করার জন্যই খেলেছিলেন? না, যারা খেলোয়াড় তারা কখনই পয়সা রোজগার করার উদ্দেশ্য নিয়ে খেলতে আসেন না। বরং খেলাটা তাদের স্বপ্ন, খেলতে ভাল লাগে বলেই তারা দেশের জন্য খেলছেন। আর রোজগার ব্যাপারটা এর পরেই আসে, কারন সবাইকেই পেট চালাতে হয়। যাইহোক, আর কথা বাড়াবো না তেমন।

সবার কাছে অনুরোধ থাকবে, শুধু সুজন ভাই নয়, আমরা আমাদের দেশের কোন খেলোয়াড়কেই ট্রল করা থেকে বিরত থাকবো। গঠনমূলক সমালোচনা আমরা করতে পারি। কিন্তু সমালোচনা আর ঠাট্টা এক জিনিস নয়। তাই, ঠাট্টা আর না করি। তারপরেও যদি কেউ ট্রল করে থাকেন তাহলে তাকে বলবো ভাই, আপনি নিজে পেশাদার ক্রিকেট খেলছেন না কেন? সুজন ভাইয়ের বোলিঙয়ের না হয় গতি নেই, মাশরাফি ভাইয়েরও আগের মত গতি নেই, সাকিব বেয়াদব, বউ নিয়ে পইড়া থাকে, তাহলে আপনারাই খেলেন। ওনাদের নিয়ে আপনাদের অনেক সমস্যা, আপনারাই একেকজন কোচ, ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ হয়ে যান তাহলে আপনারা কেন কোচের পদে আবেদন করছেন না?

আমি আপনাদের কাউকে অপমানসূচক কোন কথা বলছি না, বরং বলছি যেটা আপনারা নিজে পারবেন না, সেটা অন্যকে উপদেশ বা মজা করবেন না। আর গঠনমূলক সমালোচনা করুন, কিন্তু ট্রল বা ঠাট্টা করবেন না। আর দয়া করে, আমাকে অমুকের দালাল, আমার জ্বলে এসব বলে লাভ নেই। শেষে শুধু একটি কথা বলছি, কোরআনে একটা বাণি আছে, সেটা হল ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘণকারীকে পছন্দ করেন না।’ তাই, সীমা ছাড়িয়ে এমন কিছু না করাই আপনার আমার সবার জন্যই মঙ্গল। ভাল থাকবেন সবাই। ভুল-ত্রুটি হলে জানাবেন। আপনাদের সবার মঙ্গল কামনা করছি।

লেখকঃ Abu Bakr Siddique Liton

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry

পাঠক মতামতঃ