স্বর্ন মন্দির: পৃথিবীর সর্ববৃহৎ খাদ্যশালা

710

ক্ষুধা, বিশ্বের অন্যতম বড় সমস্যা হল এই ক্ষুধা। আজ সারা বিশ্বে প্রায় ৭৯৫ মিলিয়ন মানুষ ক্ষুধার্ত থাকে। উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত রাষ্ট্রগুলোর অন্যতম সমস্যা এই ক্ষুধা। যেখানে সারা পৃথিবীতে ক্ষুধা সমস্যা এতটাই প্রকট,সেখানে এমন একটি জায়গা আছে যেখান থেকে কেউ কখনো অভুক্ত থেকে ফেরত আসে নাই। সেখানে কোন ভেদাভেদ নেই। আপনার জাতি,ধর্ম,বর্ণ নিয়ে কেউই কোন প্রশ্ন করবে না, আপনি ক্ষুধার্ত তার মানে সেখানের দরজা আপনার জন্য খোলা।  জায়গাটির নাম স্বর্ণ মন্দির।

ভারতের পশ্চিমে অমৃতসর শহরে এই স্বর্ণ মন্দিরের অবস্থান। এখানে প্রায় ২ লক্ষ রুটি, ১.৫ টন  ডাল এবং আরও অনেক খাবার প্রতিদিন রান্না করা হয় এবং এসব খাবার বিনামূল্যে ১ লক্ষ ভক্তের মাঝে বিতরণ করা হয়। এর ফলে এই মন্দিরের খাদ্যশালা কে বলা হয় পৃথিবীর সর্ব বৃহৎ খাদ্যশালা।

স্বর্ণ মন্দিরের খাদ্যশালাকে আঞ্চলিক ভাষায় বলা হয় লঙ্গরখানা। এই লঙ্গরখানা সর্বপ্রথম শুরু করেন শিখ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গুরু নায়েক। এই লঙ্গরখানা থেকে আজ অবধি কেউ অভুক্ত থেকে বিদায় নেয় নি। প্রতিদিন এখানে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র অনুসারে আহার দেওয়া হয়।

barta1

“ এখানে যে কেউ একদম বিনামূল্যে খাদ্য খেতে পারে এবং আমরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১,০০,০০০ জনের জন্য খাবার প্রস্তুত করি। সাপ্তাহিক ছুটি কিংবা যে কোন উৎসবের দিনে লঙ্গরখানায় ঘুরতে আসা মানুষের সংখ্যা দ্বিগুনের বেশি হয়ে যায়। এই লঙ্গরখানা কখনও বন্ধ হয় না। প্রতিদিনের খাবার প্রস্তুতের জন্য প্রায় ৭,০০০ কেজি ময়দা  ১,২০০ কেজি চাল  ১,৩০০ কেজি ডাল এবং ৫০০ কেজি এর মত ঘি ব্যবহার করা হয়,” বলেছেন এই বিশাল রন্ধনশালার ম্যানেজার, হরপ্রিত সিং।

তিনি আরও জানিয়েছেন ,” এই রন্ধনশালায় রয়েছে জ্বালানী হিসেবে কাঠ, এলপিজি গ্যাস এবং ইলেক্ট্রিক রুটি তৈরীর যন্ত্র। আমরা প্রতিদিন ১,০০০ সিলিন্ডার এলপিজি গ্যাস এবং ৫,০০০ কিলোগ্রাম কাঠ ব্যবহার করি। “

স্বর্ণ মন্দিরের এই বিশাল রন্ধনশালা পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন ৪৫০ জন কর্মকর্তা। আর তাদের সাহায্য করার জন্য উপস্থিত থাকে আরও ১০০ জন স্বেচ্ছাসেবক। প্রতিদিন ৩,০০,০০০ প্লেট, চামচ, গামলা এবং আরো যা যা রান্না এবং খাবারের কাজে ব্যবহার করা হয় সব কিছুই এই স্বেচ্ছাসেবকরা পরিষ্কার করে থাকে অনেক নিষ্ঠার সাথে।  এখানকার খাবার গুলো হল নিরামিষ জাতীয়। আর এর খরচ এর বেশিরভাগই আসে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা অনুদানের মাধ্যমে। এই লঙ্গরখানার বার্ষিক খরচ হল প্রায় ১০০ মিলিয়ন রুপি।

এখন জেনে নেই বহুল আলোচিত অমৃতসরের এই স্বর্ণ মদিরের ইতিহাসঃ

এই বিশ্বে অজস্র স্থাপনা রয়েছে যাদের পরিপূর্ণ বর্ণনা পাওয়া অসম্ভব। স্বর্ণ মন্দিরটিও এর মাঝে একটি। এর বর্ণনা যতই করা হোক না কেন তা কমই হবে। অমৃতসর ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের একটি শহর। এই অমৃতসর কে পাঞ্জাবের সবথেকে মাহাত্মপূর্ণ ও পবিত্র শহর হিসেবে মানা হয়। পবিত্র মনে করার কারন হল শিখ দের সবথেকে বড় গুরুদুয়ারা এই স্বর্ণ মন্দির অমৃতসরে অবস্থিত বলে। তাজমহলের পরেই সকল পর্যটকদের ২য় পছন্দের দর্শনীয় স্থান হল এই স্বর্ণ মন্দির। অমৃতসর এর ইতিহাস গৌরবময়। অনেক রাজনৈতিক বেদনাময় ঘটনার সাক্ষী এই অমৃতসর। ভারতীয় স্বতন্ত্রতার সংগ্রামের সময় সব থেকে নৃশংস গনহত্যা এই অমৃতসরের জলীয়াওয়ালা বাগেই হয়েছিল। ভারত-পাকিস্তান বিভক্ত হওয়ার সময়ও এই অমৃতসরে অনেক হতাহত হয়। এর আগেও আফগান আর মুঘল শাশকেরা এই অমৃতসরের উপর বহু আক্রমন করে ধ্বংসস্তুপে পরিনত করেছিল। কিন্তু এই শিখদের প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর দৃঢ়সংকল্পের ফলে এই অমৃতসরকে রক্ষা করে।

গুরু গ্রন্থ সাহিব শিখ দের পবিত্র ধর্ম গ্রন্থ। প্রথম পাঁচ জন শিখ গুরু এই গ্রন্থের সংকলন করেছিলেন। এই গ্রন্থে ১৪২০ পৃষ্ঠা আছে। এই গ্রন্থে শুধু গুরুদের উপদেশই নয়, এতে হিন্দু ও মুসলিম দের ধর্মগ্রন্থের বানীও সম্মিলিত আকারে রয়েছে।

এই স্বর্ণ মন্দিরের বয়স প্রায় ৪৫০ বছর। সর্বপ্রথম গুরু রামদাস ১৫৭৭ সালে ৫০০ বিঘা জমির উপর এই গুরুদুয়ারা নির্মান করেন। গুরুদুয়ারা হল প্রার্থনা ও পূজার্চনার স্থান। এই গুরুদুয়ারা সরোবর নামক একটি হ্রদ দ্বারা পরিবেষ্টিত রয়েছে, যা পবিত্রময় জলধারা অমৃত সমন্বিত (অমর দেবসুধা হিসাবেও উল্লিখিত)। এই সরোবর নিয়ে ছোট একটা কাহিনী আছে।

পট্টি শহরের এক ধনী জমিদার দূনি চাঁদ খত্রী এই কিংবদন্তী বেড়ীর সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন, এঁনার পাঁচটি কন্যা ছিল। একদিন তিনি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, তাদেরকে খাবার কে দেয়। তাদের মধ্যে বড় চার কন্যা উত্তর দিল, তাদের পিতাই তাদের অনুগ্রহকারী বা পৃষ্ঠপোষক এবং তাদের খাবার তিনিই দেন। কিন্তু রজনী নামের কনিষ্ঠতম কন্যাটি বলল ঈশ্বরই সমস্ত জীবকে বাঁচিয়ে রাখেন। দূনী চাঁদ এই কথা শুনে ক্ষুদ্ধ হয়ে, সেই কন্যাকে একজন কুষ্ঠরোগীর সঙ্গে বিবাহ দেন। তিনি তাঁর স্বামীকে ভালোবাসতেন এবং তার যত্নও করতেন। সেই সময় গুরু রাম দাস জী অমৃতসরে একটি নতুন শহর নির্মাণ করছিলেন। রজনী তাঁর স্বামীকে অমৃতসরে নিয়ে আসেন। তিনি গুরুর ভক্তদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, তাঁরা রজনীর অবস্থার প্রতি করুণা করে থাকার জন্য একটি কক্ষ প্রদান করেন।

তাঁকে সর্বসাধারণ রান্নাঘরের মধ্যে খাবার রান্নার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি যখন তার কর্মে যোগ দিতে আসতেন তখন সঙ্গে করে তাঁর স্বামীকে নিয়ে আসতেন। স্বামীকে একটি গাছের ছায়ার নীচে বসিয়ে রান্নাঘরে ঢুকতেন। একদিন সে তার স্বামীকে একটি বেড় গাছের নীচে ছেড়ে যান। তাঁর স্বামী, লক্ষ্য করেন যে সেখানকর কিছু কাক পুকুরের জলে ডুব দিচ্ছে এবং তারা কালো থেকে সাদায় রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে। তিনি তখন বুঝতে পারলেন যে এটি কোনও সাধারণ জল নয়।

তিনি পুকুরটির সামনে গেলেন এবং জলের মধ্যে ডুব দিলেন। তিনি সুস্থ হয়ে উঠলেন এবং তিনি আর কুষ্ঠরোগী রইলেন না। তিনি পুনরায় সেই গাছের তলায় এসে বসে রইলেন। রজনী তাকে সনাক্ত করতে সক্ষম হচ্ছিলেন না। সেই যুবক তাঁকে বিশ্বস্ত করালেন এবং এই দম্পতি পুকুরটি সম্পর্কে গুরু রাম দাসজীকে বলে গেলেন। এটি শ্রবণের পর গুরু রাম দাস জী এই কথা মন্দিরের প্রধান পুরোহিত বাবা বুদ্ধ জী-কে বলেন। তিনি বলেন যে এই পুকুরটি এমন একটি স্থান যেটি গুরু অমর দাস জী-র পূর্ব প্রতীক্ষায় ছিল। বৃক্ষটি কষ্ট এবং যন্ত্রণার উপশম হিসাবে, এটি দুঃখ ভঞ্জনি বেড়ী হিসাবে পরিচিত ছিল।

মন্দিরটির সরলতার প্রতীকস্বরূপ, মন্দিরটিতে চারটি প্রবেশপথ আছে; যা জীবনের সমস্ত দিক ও পথ থেকে আসা মানুষকে স্বাগত জানায়। গোল্ডেন টেম্পল বা স্বর্ণ মন্দিরটি শিখদের জন্য একটি পবিত্র স্থান ও উপাসনার একটি জায়গা।

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry

পাঠক মতামতঃ